মহররম মাসে বিয়ে করার বিষয়টি আমাদের সমাজে একটি প্রচলিত এবং স্পর্শকাতর আলোচনা। অনেক সময় দেখা যায়, ধর্মীয় সঠিক জ্ঞানের অভাব এবং বিভিন্ন লোকজ বিশ্বাসের কারণে সাধারণ মানুষের মনে এই মাসে বিয়ে করা নিয়ে নানাবিধ সংশয় ও বিভ্রান্তি তৈরি হয়। কোরআন, হাদিস, যুক্তি, ইসলামি আইনবিদ (আলেম ও মুহাদ্দিসগণ) এবং সুফি সাধকদের দৃষ্টিভঙ্গি বিশ্লেষণ করে একটি বিস্তারিত ও তথ্যবহুল আলোচনা নিচে উপস্থাপন করা হলো।
ইসলাম একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা। মানুষের জীবনের প্রতিটি ধাপ জন্ম, মৃত্যু, জীবিকা এবং বিবাহ সবকিছুই ইসলামের সুনির্দিষ্ট নিয়মনীতি এবং নির্দেশনার আওতাভুক্ত। বিবাহ ইসলামের দৃষ্টিতে কেবল একটি সামাজিক চুক্তি নয়, বরং এটি একটি অত্যন্ত পবিত্র ইবাদত এবং মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সুন্নত।
তবে আমাদের মুসলিম সমাজের একটি বড় অংশে এই ধারণা প্রচলিত রয়েছে যে, হিজরি সনের প্রথম মাস অর্থাৎ 'মহররম' মাসে বিবাহ বা কোনো শুভ কাজ করা উচিত নয়। বিশেষ করে মহররমের প্রথম ১০ দিন, যা কারবালার ঐতিহাসিক ও হৃদয়বিদারক ট্র্যাজেডির সাথে সম্পর্কিত, সেই দিনগুলোতে আনন্দ-উৎসব বা বিয়ের আয়োজন করাকে অনেকে অমঙ্গলজনক বা নিষিদ্ধ মনে করেন। কিন্তু ইসলামি শরিয়তের প্রকৃত অবস্থান কী? কোরআন, সুন্নাহ এবং মুসলিম মনীষীদের দৃষ্টিভঙ্গি বিশ্লেষণ করলে এই বিষয়ে একটি সুস্পষ্ট ও বিভ্রান্তিমুক্ত ধারণা পাওয়া যায়।
কোরআনের দৃষ্টিকোণ থেকে
পবিত্র কোরআনের কোথাও মহররম মাসে বিয়ে করা নিষিদ্ধ বা হারাম এমন কোনো আয়াত অবতীর্ণ হয়নি। বরং আল্লাহ তাআলা সময় এবং মাসসমূহকে মানুষের কল্যাণের জন্য সৃষ্টি করেছেন।
কোরআনে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন:
"নিশ্চয় আল্লাহর বিধান ও গণনায় মাস বারোটি, আসমানসমূহ ও পৃথিবী সৃষ্টির দিন থেকে। এর মধ্যে চারটি সম্মানিত" (সূরা আত-তাওবাহ, আয়াত: ৩৬)
এই চারটি সম্মানিত মাসের (আশহুরুল হুরুম) অন্যতম একটি হলো মহররম। ইসলামের দৃষ্টিতে এই সম্মানিত মাসগুলোতে যুদ্ধবিগ্রহ নিষিদ্ধ এবং ইবাদত-বন্দেগির গুরুত্ব অনেক বেশি। কোরআনের কোথাও কোনো মাস বা দিনকে 'অশুভ' বা 'বিয়ে শাদির অযোগ্য' বলে ঘোষণা করা হয়নি। ইসলামে 'শুভ দিন' বা 'অশুভ দিন' বলতে কোনো ধারণা নেই। প্রতিটি দিন ও ক্ষণই আল্লাহর সৃষ্টি। সুতরাং, কোরআনের সাধারণ নির্দেশনা অনুযায়ী মহররম মাসে বিয়ে সম্পূর্ণ বৈধ।
হাদিস ও সুন্নাহর আলোকপাত
রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর হাদিস এবং তাঁর পবিত্র জীবনের (সুন্নত) দিকে তাকালে আমরা দেখতে পাই যে, কোনো নির্দিষ্ট মাসকে বিয়ের জন্য নিষিদ্ধ করা জাহেলি যুগের কুসংস্কারের শামিল।
জাহেলি যুগের কুসংস্কারের খণ্ডন
ইসলামের আগমনের পূর্বে আরবের মানুষেরা 'শাওয়াল' বা 'মহররম' এর মতো নির্দিষ্ট কিছু মাসে বিয়ে করাকে অমঙ্গলজনক মনে করত। রাসূলুল্লাহ (সা.) এই ধারণাকে কঠোরভাবে খণ্ডন করেছেন। উম্মুল মুমিনীন হযরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন:
"রাসূলুল্লাহ (সা.) শাওয়াল মাসেই আমাকে বিয়ে করেছিলেন এবং শাওয়াল মাসেই আমার বাসর হয়েছিল। অথচ রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর স্ত্রীদের মধ্যে তাঁর কাছে আমার চেয়ে অধিক প্রিয় আর কে ছিল?"
(সহীহ মুসলিম, হাদিস নং: ১৪২৩)
এই হাদিসটি প্রমাণ করে যে, সমাজে প্রচলিত নির্দিষ্ট মাসের অশুভত্বের ধারণা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। মহররম মাসের ক্ষেত্রেও একই নিয়ম প্রযোজ্য।
তাকদির ও কুলক্ষণের নিষেধাজ্ঞা
হাদিসে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে যে, কোনো দিন, মাস বা পাখিকে অশুভ মনে করা (যাকে ইসলামে 'তিয়ারা' বা কুলক্ষণ বলা হয়) শিরকের অন্তর্ভুক্ত।
রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
"ইসলামে ছোঁয়াচে রোগ এবং অশুভ লক্ষণ বলতে কিছু নেই।" (সহীহ বুখারী, হাদিস নং: ৫৭৫৭)
অতএব, মহররম মাসকে বিয়ের জন্য অশুভ মনে করা সুন্নাহ পরিপন্থী একটি কাজ।
আলেম, ফকিহগণ ও ইসলামি আইনবিদের মতামত
ইসলামের চার ইমাম (ইমাম আবু হানিফা, ইমাম মালিক, ইমাম শাফেয়ী ও ইমাম আহমদ বিন হাম্বল) এবং পরবর্তী যুগের বড় বড় ফকিহ ও আলেমগণ একমত যে, বছরের যেকোনো দিন বা মাসে বিয়ে করা জায়েজ।
ইজমা (ঐক্যমত) সমস্ত ফিকহশাস্ত্রের কিতাবে বিয়ের জন্য নিষিদ্ধ সময়ের যে তালিকা দেওয়া হয়েছে, তাতে কেবল 'এহরাম' পরিহিত অবস্থা (হজ বা ওমরাহর সময়) এবং 'রোজা' রাখা অবস্থায় দিনের বেলা সহবাসের নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। মহররম মাসের নাম কোথাও নিষিদ্ধ হিসেবে উল্লেখ নেই।
সমসাময়িক ফতোয়া:
সৌদি আরবের স্থায়ী ফতোয়া কমিটি (লাজনাদ দাইমাহ), মিসরের আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয় এবং দেওবন্দ ঘরানার আলেমদের ফতোয়া অনুযায়ী, মহররম মাসে বিয়ে শাদি করা শরিয়তের দৃষ্টিতে শতভাগ বৈধ এবং এতে কোনো ধরনের গুনাহ বা অমঙ্গল নেই।
মুহাদ্দিসগণের বিশ্লেষণ মতামত
মুহাদ্দিস এবং ইসলামি ঐতিহাসিকগণ এই বিষয়ে ইতিহাসের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কিছু তথ্য তুলে ধরেছেন, যা মহররম মাসে বিয়ের বৈধতাকে আরও দৃঢ় করে।
ঐতিহাসিক বর্ণনা অনুযায়ী, ইসলামের ইতিহাসের অনেক গুরুত্বপূর্ণ এবং বরকতময় বিবাহ মহররম মাসেই সম্পাদিত হয়েছিল। যেমন:
হযরত আলী (রা.) ও হযরত ফাতিমা (রা.)-এর বিবাহ কোনো কোনো ঐতিহাসিক বর্ণনা মতে, আদি মুসলিম সমাজের সবচেয়ে সম্মানিত দম্পতি হযরত আলী (রা.) ও খাতুনে জান্নাত হযরত ফাতিমা (রা.)-এর শুভ বিবাহ হিজরি ২য় সনের মহররম মাসে অথবা এর কাছাকাছি সময়ে সম্পন্ন হয়েছিল।
হযরত উমর (রা.) ও হযরত উম্মে কুলসুম (রা.)-এর বিবাহ আমীরুল মুমিনীন হযরত উমর (রা.) হযরত আলী (রা.)-এর কন্যা উম্মে কুলসুমকে মহররম মাসেই বিয়ে করেছিলেন।
মুহাদ্দিসগণ বলেন, যদি মহররম মাসে বিয়ে করা নিষিদ্ধ বা অশুভ হতো, তবে আহলে বাইত (রাসূলের পরিবার) এবং সাহাবায়ে কেরাম কখনো এই মাসে বিয়ের বন্ধনে আবদ্ধ হতেন না।
সুফি ও আধ্যাত্মিক সাধকদের দৃষ্টিভঙ্গি
সুফি সাধক এবং তাসাউফের ইমামগণ বিষয়টিকে আধ্যাত্মিক এবং মনস্তাত্ত্বিক কোণ থেকে ব্যাখ্যা করেছেন। সুফিবাদের মূল কথা হলো আল্লাহর সন্তুষ্টি এবং রাসূলের সুন্নতের অনুসরণ।
শোক ও ইবাদতের সমন্বয়: সুফিগণ কারবালার চেতনাকে হৃদয়ে ধারণ করেন। ১০ই মহররম (আশুরা) হযরত ইমাম হোসেন (রা.) ও তাঁর পরিবারের শাহাদাতের ঘটনা মুসলিম উম্মাহর জন্য অত্যন্ত বেদনাদায়ক। সুফিদের মতে, এই মাসে অনর্থক জাঁকজমক, অপচয় বা উগ্র আনন্দ-উল্লাস এড়িয়ে চলা উত্তম, কারণ এটি আত্মশুদ্ধি এবং ত্যাগের মাস।
সুন্নতের মর্যাদা: তবে সুফি ঘরানার মহান সাধকগণ (যেমন আব্দুল কাদির জিলানী রহ., খাজা মঈনুদ্দিন চিশতী রহ.) কখনোই আল্লাহর হালালকৃত কোনো বিষয়কে হারাম করার পক্ষপাতী ছিলেন না। তাঁদের মতে, বিয়ে হলো একটি ইবাদত। মহররম মাসে যদি কেউ জাঁকজমকহীনভাবে, সুন্নতি তরিকায়, আল্লাহর দরবারে শুকরিয়া আদায় করে বিয়ে করে, তবে তা আধ্যাত্মিক উন্নতির পথে কোনো বাধা সৃষ্টি করে না।
যৌক্তিক ও সামাজিক বিশ্লেষণ
ইসলাম একটি অত্যন্ত যুক্তিবাদী ধর্ম। আমরা যদি বুদ্ধি ও যুক্তির নিরিখে বিষয়টি বিবেচনা করি, তবে নিচের বিষয়গুলো স্পষ্ট হয়।
মৃত্যু ও আনন্দের সহাবস্থান পৃথিবীতে প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ মারা যায় এবং হাজার হাজার শিশু জন্মগ্রহণ করে। কারবালার ঐতিহাসিক ট্র্যাজেডি হিজরি ৬১ সনে ঘটেছিল। ইসলামের নিয়ম অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তির মৃত্যুতে সর্বোচ্চ তিন দিন (স্ত্রীর জন্য চার মাস দশ দিন) শোক পালনের অনুমতি রয়েছে। প্রতি বছর একটি নির্দিষ্ট মাসে শুধু শোক প্রকাশের অজুহাতে আল্লাহর একটি পবিত্র বিধানকে (বিয়ে) পিছিয়ে দেওয়া যুক্তিসঙ্গত নয়।
কুসংস্কারের কুফল
মহররম মাসে বিয়ে করলে সংসার টিকবে না বা অমঙ্গল হবে এমন বিশ্বাস এক ধরণের কুসংস্কার, যা মানুষের ঈমানকে দুর্বল করে। মানুষের সুখ-দুঃখ, ভালো-মন্দ সবকিছুই আল্লাহর হুকুম এবং মানুষের নিজেদের কর্মের ওপর নির্ভর করে, কোনো মাসের ওপর নয়।
পরিশেষে বলা যায়, কোরআন, হাদিস, আলেম, মুহাদ্দিস এবং সুফি সাধকদের সম্মিলিত মতামত ও ইসলামি শরিয়তের অকাট্য দলিল অনুযায়ী মহররম মাসে বিয়ে করা সম্পূর্ণ জায়েজ এবং বৈধ। এতে ধর্মীয় কোনো নিষেধাজ্ঞা বা পাপ নেই।
কারবালার হৃদয়বিদারক ঘটনার প্রতি শ্রদ্ধা ও শোক প্রকাশ করা প্রতিটি মুমিনের ঈমানি দায়িত্ব, তবে সেই শোককে কেন্দ্র করে কোনো হালাল কাজকে হারাম মনে করা ইসলাম সমর্থন করে না। অতএব, সমাজ থেকে এই জাতীয় কুসংস্কার দূর করা আমাদের কর্তব্য। অপচয় ও অনৈসলামিক রীতিনীতি পরিহার করে, যেকোনো মাসেই অত্যন্ত সাদামাটা ও সুন্নতি উপায়ে বিয়ের আয়োজন করা হলে তাতে আল্লাহর রহমত ও বরকত নাজিল হয়।
কুসংস্কার থেকে দূরে রাখতে আর্টিকেলটি শেয়ার করুন। আপনার বন্ধুবান্ধব, আত্মীয়স্বজনদের সাথে
সুতরাং আমরা কুসংস্কার থেকে দুরে থাকবো এবং অপরকে দূরে রাখবো শরীয়তের নিয়ম কানুন ও কোরআন হাদিসের আলোকে জীবনযাপন করবো। আমিন

0 মন্তব্যসমূহ