![]() |
| কারবালা |
কারবালার ট্র্যাজেডিতে ইয়াযীদের ঐতিহাসিক দায় ও মুসলিম উম্মাহর অবস্থান
ইসলামের ইতিহাসে হিজরি ৬১ সনের ১০ই মহররম কারবালার প্রান্তরে সংঘটিত হত্যাকাণ্ড কেবল একটি রাজনৈতিক ক্ষমতার দ্বন্দ্ব ছিল না, বরং এটি ছিল সত্য ও অসত্য, ন্যায় ও অন্যায় এবং খেলাফত ও রাজতন্ত্রের মধ্যকার এক চিরন্তন সংঘাত। রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর প্রিয় দৌহিত্র, জান্নাতের যুবকদের নেতা হযরত ইমাম হুসাইন (রা:) এবং তাঁর আহলে বায়েতের (পরিবারবর্গ) ওপর যে অমানবিক ও নৃশংস জুলুম চালানো হয়েছিল, তা কিয়ামত পর্যন্ত মানব ইতিহাসের সবচেয়ে কলঙ্কজনক অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত থাকবে। বর্তমান যুগে ইসলামের এই চরম বেদনাদায়ক ইতিহাসকে বিকৃত করার এবং কারবালার মূল খলনায়ক ইয়াযীদুল মুয়াবিয়াকে নির্দোষ প্রমাণ করার এক অপচেষ্টা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। তবে নির্ভরযোগ্য ঐতিহাসিক দলিল, মুজতাহিদ ইমামগণের সিদ্ধান্ত এবং রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর সুসংবাদ ও ভবিষ্যৎবাণীর আলোকে ইয়াযীদের অপরাধ ও দায় একেবারে স্পষ্ট।
ইয়াযীদের শাসন ও কারবালা
ইসলামের শাসনব্যবস্থা যেখানে শুরা বা পারস্পরিক পরামর্শের ওপর প্রতিষ্ঠিত ছিল, ইয়াযীদের পিতা আমীর মুয়াবিয়ার মাধ্যমে সেখানে বংশানুক্রমিক রাজতন্ত্রের সূচনা হয়। ইয়াযীদের শাসনভার গ্রহণ ছিল শরিয়তের মূল চেতনার পরিপন্থী। চরিত্রগতভাবে ইয়াযীদ ছিল ফাসেক, জালিম এবং মদ্যপায়ী ও পাপাচারের সাথে লিপ্ত এক ব্যক্তি। এমন একজন অযোগ্য ও পাপিষ্ঠ ব্যক্তির হাতে উম্মাহর নেতৃত্ব চলে যাওয়া এবং তার প্রতি আনুগত্যের বাইয়াত (শপথ) গ্রহণ করা হযরত ইমাম হুসাইন (রা:)-এর পক্ষে অসম্ভব ছিল। তিনি ইসলামের মৌলিক আদর্শ ও খেলাফতের মর্যাদা রক্ষার জন্য ইয়াযীদের অন্যায় শাসনের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ান। এরই ধারাবাহিকতায় কুফাবাসীদের আহ্বানে সাড়া দিয়ে তিনি যখন সপরিবারে ইরাকের দিকে রওনা হন, তখন ইয়াযীদী বাহিনী কারবালার মরুভূমিতে তাঁকে অবরুদ্ধ করে।
কারবালার ঘটনায় ইয়াযীদের প্রত্যক্ষ দায়: ঐতিহাসিক দলিল
অনেকে দাবি করার চেষ্টা করেন যে, কারবালার হত্যাকাণ্ড কুফার গভর্নর ইবনে যিয়াদের একক সিদ্ধান্তে হয়েছিল এবং এতে দামেস্কে অবস্থানরত ইয়াযীদের কোনো হাত বা নির্দেশ ছিল না। এই দাবি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন এবং ঐতিহাসিক সত্যের অপলাপ। ইয়াযীদের নির্দেশ এবং পূর্ণ সমর্থনেই এই পুরো হত্যাকাণ্ড ও আহলে বায়েতের ওপর বর্বর নির্যাতন চালানো হয়েছিল।
বিখ্যাত ইতিহাসবিদ হাফেজ ইবনে কাসীর (রহ.) তাঁর যুগান্তকারী গ্রন্থ ‘আল-বেদায়া ওয়ান-নেহায়া’-এর চতুর্থ খণ্ডের ১৮৮ পৃষ্ঠায় নির্ভরযোগ্য সনদসহ কারবালা-পরবর্তী দামেস্কের রাজসভার যে বিবরণ দিয়েছেন, তা ইয়াযীদের প্রত্যক্ষ সম্পৃক্ততা ও অহংকারকে প্রমাণ করে।
ইয়াযীদের দরবারে আহলে বায়েত এবং ইয়াযীদের ঔদ্ধত্য
ইমাম হুসাইন (রা:) এবং উনার সাথে থাকা ৭২ জন শহীদের পবিত্র মাথা মুবারক যখন বর্শার ডগায় বিদ্ধ করে দামেস্কে ইয়াযীদের দরবারে আনা হলো, তখন সেখানে আহলে বায়েতের বেঁচে থাকা নারী ও শিশুরা শৃঙ্খলিত অবস্থায় উপস্থিত ছিলেন। ইয়াযীদ তৎকালীন শামের (সিরিয়া) গণ্যমান্য ব্যক্তিত্ব, বুদ্ধিজীবী এবং প্রভাবশালী ব্যবসায়ীদের ডেকে এনে এক জঘন্য তামাশার আয়োজন করে।
ইমাম হুসাইন (রা:)-এর রক্তক্ষয়ী কাটা মাথার সামনে দাঁড়িয়ে ইয়াযীদ ইমামের বীরপুত্র হযরত আলী ইবনুল হুসাইন (যিনি ‘যয়নুল আবেদীন’ এবং ইলমের গভীরতার জন্য ‘বাকের’ নামে পরিচিত) এবং আহলে বায়েতের মহিলাদের সম্বোধন করে অহংকারবশত বলেছিল:
"يا عليّ! أبوك قطع رحمي، وجهل حقّي، ونازَعَني سُلطاني، فصنعَ اللَّهُ به ما قد رأيت."
অর্থ: “হে আলী! তোমার পিতা (হুসাইন) আমার সাথে আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করেছিল, আমার প্রাপ্য অধিকার ও হক বুঝতে চায়নি এবং আমার সালতানাত বা রাজত্ব নিয়ে আমার সাথে কাড়াকাড়ি করেছিল। অতঃপর আল্লাহ তাঁর সাথে কী করেছেন, তা তো তুমি নিজের চোখেই দেখলে।” (নাউজুবিল্লাহ)
ইয়াযীদের এই বক্তব্য স্পষ্ট প্রমাণ করে যে, সে ইমাম হুসাইন (রা:)-এর এই নির্মম শাহাদাতকে আল্লাহর পক্ষ থেকে নিজের রাজতান্ত্রিক ক্ষমতার বৈধতা এবং ইমামের জন্য (নাউজুবিল্লাহ) শাস্তি হিসেবে দেখছিল। এটি কোনো অনুতপ্ত শাসকের ভাষা হতে পারে না, বরং এটি ছিল এক অহংকারী জালিমের দম্ভোক্তি।
হযরত যয়নুল আবেদীন (রহ.)-এর অকুতোভয় জবাব
ইয়াযীদের এই অন্যায় ও অহংকারী বক্তব্যের জবাবে বালক বয়সেও হযরত যয়নুল আবেদীন (রহ.) অত্যন্ত বীরত্বের সাথে পবিত্র কুরআনের সূরা হাদীদের ২২ নম্বর আয়াত তিলাওয়াত করে জবাব দেন:
﴿مَا أَصَابَ مِنْ مُصِيبَةٍ فِي الْأَرْضِ وَلَا فِي أَنْفُسِكُمْ إِلَّا فِي كِتَابٍ مِنْ قَبْلِ أَنْ نَبْرَأَهَا﴾
অর্থ: “পৃথিবীতে অথবা ব্যক্তিগতভাবে তোমাদের ওপর যে বিপর্যয়ই আসুক না কেন, তা জগৎ সৃষ্টির পূর্বেই কিতাবে (তকদীরে) লিপিবদ্ধ রয়েছে।”
তিনি বুঝিয়ে দিলেন যে, কারবালার এই রক্তক্ষয়ী ময়দানে তাঁর পিতা ও স্বজনদের শাহাদাত কোনো পরাজয় নয়, বরং এটি আল্লাহর দরবারে তাঁদের জন্য নির্ধারিত তকদীরের সর্বোচ্চ সম্মান ও শাহাদাতের মাকাম।
এই জাজ্বল্যমান জবাব শুনে ইয়াযীদ লজ্জিত ও পরাস্ত হয়ে তার পুত্র খালেদকে এর উত্তর দেওয়ার নির্দেশ দেয় (أَجِبْه)। কিন্তু খালেদ কুরআন ও সত্যের এই অকাট্য দলিলের সামনে কোনো উত্তর খুঁজে পায়নি (فما درى خالد ما يردُّ عليه)। অতঃপর ইয়াযীদ নিজের পরাজয় ঢাকতে সূরা শুরার ৩০ নম্বর আয়াত (وَمَا أَصَابَكُمْ مِنْ مُصِيبَةٍ فَبِمَا كَسَبَتْ أَيْدِيكُمْ) পড়ে বিষয়টিকে ভিন্নখাতে নেওয়ার চেষ্টা করে এবং উবাইদুল্লাহ ইবনে মারজানার (ইবনে যিয়াদ) ওপর সাময়িক দোষ চাপানোর ভণ্ডামি করে। কিন্তু বাস্তবে ইয়াযীদ এই হত্যাকাণ্ডের হোতাদের কোনো শাস্তি দেয়নি, বরং কুফার গভর্নর ইবনে যিয়াদসহ খুনিদের পুরস্কৃত ও উচ্চ পদে বহাল রেখেছিল। ফলে কারবালার রক্তের দায় সম্পূর্ণভাবে ইয়াযীদের ওপরই বর্তায়।
ইয়াযীদের ব্যাপারে ইসলামের ইমাম ও মুজতাহিদগণের অবস্থান
ইসলামের ইতিহাসে সুন্নি উম্মাহর নির্ভরযোগ্য আলেম, ফকিহ এবং মুজতাহিদগণের কেউই ইয়াযীদকে ভালো বা ন্যায়পরায়ণ শাসক হিসেবে স্বীকৃতি দেননি। ইয়াযীদের ব্যাপারে উলামায়ে কেরামের প্রধানত দুটি মত রয়েছে:
১. ইয়াযীদকে ‘কাফের’ বা কুফরির স্তরে গণ্য করার মত:
ইসলামের অন্যতম প্রধান ইমাম, ইমাম আহমদ বিন হাম্বল (রহ.) এবং হিদায়া গ্রন্থের বিখ্যাত ব্যাখ্যাগ্রন্থ ‘ফাতহুল কদীর’-এর লেখক ইবনু হুমাম (রহ.) সহ ইতিহাসের অন্তত ২৭ জন প্রখ্যাত মুজতাহিদ ইমাম ইয়াযীদের জঘন্য অপরাধ, মক্কা-মদিনায় আক্রমণ (হাররার যুদ্ধ) এবং কারবালার নৃশংসতার কারণে তাকে ‘কাফের’ বা অভিশপ্ত বলেছেন। ড. সাইয়্যেদ এনায়েতুল্লাহ আব্বাসীর মতে, এটি একটি অত্যন্ত শক্তিশালী এবং দলিলভিত্তিক অবস্থান, যা ইয়াযীদের প্রতি তীব্র ঘৃণার বহিঃপ্রকাশ।
২. ইয়াযীদকে ‘ফাসেক ও ফাজেল’ গণ্য করার মত:
অপরদিকে ইমাম আযম আবু হানিফা (রহ.) সহ জৌনপুর, ফুরফুরা এবং দেওবন্দের ওলামায়ে কেরামসহ জুমহুর আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাত ইয়াযীদকে কাফের না বললেও তাকে চরম ‘ফাসেক’, ‘ফাজের’ (পাপী) এবং ‘জালিম’ হিসেবে একমত হয়েছেন। ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর যুগে ইয়াযীদের কুফরির ব্যাপারে সব তথ্য ও দলিল হয়তো সমকালীন রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে হুবহু পৌঁছায়নি, যার কারণে তিনি সতর্কতা অবলম্বন করেছিলেন। তবে কোনো সুন্নি আলেম বা হকপন্থী সিলসিলা ইয়াযীদকে বিন্দুমাত্র ভালো বলার বা তার পক্ষাবলম্বন করার সুযোগ দেননি।
সিদ্ধান্ত: ইয়াযীদ কাফের হোক বা চরম ফাসেক—উভয় মতেই সে উম্মাহর নিকট এক ঘৃণিত চরিত্র। যারা বর্তমান যুগে ইয়াযীদকে ‘রাযিয়াল্লাহু আনহু’ বলার বা তাকে নির্দোষ প্রমাণ করার দালালি করে, তারা মূলত আহলে বায়েতের শত্রু এবং দুনিয়া ও আখিরাতে তাদের জন্য রয়েছে লা’নত ও অপমান।
কারবালার ট্র্যাজেডিতে রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর আধ্যাত্মিক কষ্ট ও হাদিসের সাক্ষ্য
কারবালার ঘটনা কেবল হিজরি ৬১ সনের একটি পার্থিব ঘটনা নয়, বরং এর সাথে জড়িয়ে আছে রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর রূহানি বা আধ্যাত্মিক কষ্ট। ইমাম হুসাইন (রা:)-এর শাহাদাতের খবর এবং রক্ত রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর দরবারে পৌঁছেছিল, যা সহীহ হাদিস দ্বারা প্রমাণিত।
১. ইবনে আব্বাস (রা:) থেকে বর্ণিত হাদিস (মুসনাদে আহমদ)
ইমাম আহমদ বিন হাম্বল (রহ.) তাঁর ‘মুসনাদ’-এ, ইমাম তাবরানী ‘আল-মু’জাম আল-কাবীর’-এ এবং ইমাম হাইসামী ‘মাজমাউজ জাওয়ায়েদ’-এ অত্যন্ত শক্তিশালী সনদে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা:) থেকে বর্ণনা করেছেন। ইবনে আব্বাস (রা:) বলেন:
"رَأَيْتُ رَسُولَ اللَّهِ ﷺ فِي الْمَنَامِ نِصْفَ النَّهَارِ، أَشْعَثَ أَغْبَرَ، مَعَهُ قَارُورَةٌ فِيهَا دَمٌ، فَقُلْتُ: بِأَبِي أَنْتَ وَأُمِّي يَا رَسُولَ اللَّهِ، مَا هَذَا؟ قَالَ: هَذَا دَمُ الْحُسَيْنِ وَأَصْحَابِهِ، لَمْ أَزَلْ أَلْتَقِطُهُ مُنْذُ الْيَوْمِ."
অর্থ: “আমি একদিন ঠিক দুপুরে স্বপ্নে রাসুলুল্লাহ ﷺ-কে দেখলাম। তিনি অত্যন্ত ধূলিমলিন ও বিষণ্ণ অবস্থায় দাঁড়িয়ে আছেন। তাঁর পবিত্র হাত মুবারকে একটি কাঁচের বোতল ছিল, যার মধ্যে তাজা রক্ত। আমি আরজ করলাম, ‘হে আল্লাহর রাসুল! আমার পিতা-মাতা আপনার ওপর উৎসর্গ হোক, এটি কী?’ রাসুলুল্লাহ ﷺ বললেন, ‘এটি হুসাইন এবং তার সঙ্গীদের রক্ত। আমি আজকের দিন থেকে (কারবালার ময়দান থেকে) এই রক্ত সংগ্রহ করছি এবং আল্লাহর দরবারে তা পেশ করব।
এই হাদিসটি প্রমাণ করে যে, ১০ই মহররম কারবালার প্রান্তরে যখন ইমাম হুসাইন (রা:) শহীদ হচ্ছিলেন, তখন মদিনায় বা রূহানি জগতে রাসুলুল্লাহ ﷺ স্বয়ং সেই কষ্টের অংশীদার ছিলেন।
২. উম্মুল মুমিনীন হযরত উম্মে সালামা (রা:) থেকে বর্ণিত হাদিস
ইমাম বায়হাকী তাঁর ‘দালাইলুন নুবুওয়াত’-এর সপ্তম খণ্ডে এবং ইবনে কাসীর তাঁর ইতিহাসে হাসান-সহীহ সনদে বর্ণনা করেছেন যে, সালমা নামক এক বর্ণনাকারী ১০ই মহররমের দুপুরে উম্মুল মুমিনীন হযরত উম্মে সালামা (রা:)-এর ঘরে গিয়ে তাঁকে কাঁদতে দেখেন। কাঁদার কারণ জিজ্ঞাসা করা হলে উম্মে সালামা (রা:) বলেন:
"رأيت رسول الله ﷺ في المنام، وعلى رأسه ولحيته التراب، فقلت: ما لك يا رسول الله ﷺ؟ قال: شهدت قتل الحسين آنفا."
অর্থ: “আমি স্বপ্নে রাসুলুল্লাহ ﷺ-কে দেখেছি। তাঁর পবিত্র মাথা ও দাড়ি মুবারক ধুলাবালিতে ধূসরিত ছিল। আমি জিজ্ঞেস করলাম, ‘ইয়া রাসুলুল্লাহ! আপনার এই অবস্থা কেন?’ তিনি বললেন, ‘এইমাত্র আমি হুসাইনের হত্যাকাণ্ড (শাহাদাত) সচক্ষে প্রত্যক্ষ করে আসলাম।
এই সমস্ত সহীহ রেওয়ায়েত প্রমাণ করে যে, কারবালার ঘটনায় রাসুলুল্লাহ ﷺ নিজে প্রচণ্ড কষ্ট পেয়েছেন। সুতরাং, যারা ইয়াযীদের পক্ষে সাফাই গায় বা ইমাম হুসাইনের সমালোচনা করে, তারা প্রকারান্তরে রাসুলুল্লাহ ﷺ-কে কষ্ট দেয়। আর রাসুলুল্লাহ ﷺ-কে কষ্ট দিয়ে কেউ নিজেকে উম্মত বলে দাবি করার অধিকার রাখে না।
১০ই মহররমের অপসংস্কৃতি: শিয়া ও ইয়াযীদিপন্থীদের গোমরাহী
১০ই মহররম বা আশুরার দিনটিকে কেন্দ্র করে বর্তমান মুসলিম সমাজে দুটি চরমপন্থী ও ভ্রান্ত ধারার সৃষ্টি হয়েছে, যার উভয়টিই শরিয়ত পরিপন্থী।
ভ্রান্ত দল/ধারা - কাজের প্রকৃতি - শরিয়তের হুকুম
আহলুত তাশাইয়্যু (শিয়া/রাফেযী) তাজিয়া মিছিল, বুক চাপড়ানো, শরীর রক্তাক্ত করা, মাতম এবং সাহাবিদের গালিগালাজ করা। নিন্দনীয় ও পথভ্রষ্টতা (গোমরাহী): ইসলামে এভাবে মাতম করা বা শরীর রক্তাক্ত করা সম্পূর্ণ হারাম।
ইয়াযীদিপন্থী/নাসেবী (সুন্নি নামধারী কিছু লোক) নতুন কাপড় পরা, ভালো খাবারের আয়োজন করা, আনন্দ উৎসব করা এবং কারবালার শোককে হালকা করা। চরম উদাসীনতা ও গোমরাহী: রাসুলের পরিবারের এই চরম কষ্টের দিনে শিয়াদের বিরোধিতা করার অজুহাতে আনন্দ প্রকাশ করা ঈমানী চেতনার পরিপন্থী।
হকপন্থী মুসলমানদের দায়িত্ব হলো, শিয়াদের মাতম ও তাজিয়ার মতো বেদআত ও কুসংস্কার বর্জন করা, আবার একই সাথে ইয়াযীদিপন্থীদের মতো আনন্দ উৎসব না করে গভীর শ্রদ্ধায়, ভালোবাসায় কারবালার শহীদদের স্মরণ করা এবং আল্লাহর দরবারে তাঁদের মাগফিরাত ও দরাজাত বুলন্দের জন্য দোয়া করা।
কারবালার ঘটনায় ইয়াযীদের ঐতিহাসিক ও ধর্মীয় অপরাধ দিবালোকের মতো স্পষ্ট। সে কেবল ইমাম হুসাইন (রা:)-এর শাহাদাতের নির্দেশদাতাই ছিল না, বরং আহলে বায়েতের ওপর করা জুলুমের চূড়ান্ত সমর্থনকারীও ছিল। ইমাম হুসাইন (রা:) নিজের জীবন ও পরিবারের রক্ত বিসর্জন দিয়ে রাজতন্ত্রের কাছে মাথা নত না করে কেয়ামত পর্যন্ত আগত মুসলমানদের জন্য এক অনবদ্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করে গেছেন। রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর পবিত্র আহলে বায়েতকে ভালোবাসা ঈমানের অঙ্গ। তাই কারবালার এই শোকাবহ দিনে প্রত্যেক মুমিনের হৃদয় ইমাম হুসাইনের ভালোবাসায় ব্যথিত হবে এবং ইয়াযীদের মতো জালিমদের প্রতি থাকবে তীব্র ঘৃণা। ইয়াযীদের পক্ষে উকালতি বা দালালি করার কোনো সুযোগ ইসলামে নেই; যারা তা করবে, তারা দুনিয়া ও আখিরাতে লাঞ্ছিত হবে। আর যারা ইমাম হুসাইন (রা:)-এর আদর্শ আঁকড়ে থাকবে, তাদের জন্য রয়েছে আল্লাহর মাগফিরাত এবং জান্নাতের চিরন্তন নেয়ামত।
আমিন।

0 মন্তব্যসমূহ