জুতোর উপর জুতো রাখা এবং জুতো উল্টো করে রাখা কি কুসংস্কার ? ইসলাম কী বলে

Superstition about shoes in Islam Keeping shoes upside down Islam Shoe superstition myth and realityজুতোর ওপর জুতো রাখা কি অমঙ্গল জুতো উল্টো থাকলে কি হয় বাঙালি সমাজের প্রচলিত কুসংস্কার জুতো সোজা করে রাখার কারণজুতোর ওপর জুতো রাখা ইসলাম কি বলে জুতো উল্টো করে রাখা কুসংস্কার জুতো উল্টো রাখা কি গুনাহ জুতো নিয়ে ইসলামের বিধান ইসলামে কুসংস্কারের হুকুম

 

জুতোর উপর জুতো রাখা বা জুতো উল্টো করে রাখা নিয়ে আমাদের সমাজে নানা রকমের ধারণা প্রচলিত রয়েছে। তবে এ বিষয়ে ইসলামের স্পষ্ট দৃষ্টিভঙ্গি এবং সামাজিক-মনস্তাত্ত্বিক কারণগুলো নিচে আলোচনা করা হলো

আমাদের সমাজে প্রচলিত কিছু ধারণা যেমন জুতো উল্টো করে রাখলে ঘরে ঝগড়া-বিবাদ হয়, রিজিক কমে যায়, কিংবা জুতোর উপর জুতো রাখলে ভ্রমণ বা সফর হয় এগুলো সম্পূর্ণ কুসংস্কার বা অমূলক বিশ্বাস। ইসলামে এ ধরনের ধারণার কোনো ভিত্তি নেই। কোনো বস্তু বা কাজের মধ্যে নিজে থেকে অকল্যাণ ডেকে আনার ক্ষমতা রয়েছে বলে বিশ্বাস করা ইসলামের দৃষ্টিতে 'শির্ক' বা 'বদমিনতি' (অশুভ লক্ষণ)-এর অন্তর্ভুক্ত, যা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।

পবিত্র কোরআন বা কোনো সহিহ হাদিসে সরাসরি জুতো উল্টো রাখা যাবে না বা জুতোর উপর জুতো রাখা যাবে না এমন কোনো নির্দিষ্ট নিষেধাজ্ঞা আসেনি। তবে ইসলামের সাধারণ কিছু নীতি ও আদবের আলোকেই বিষয়টি বিবেচনা করা যায়।

 অসম্মান প্রদর্শন: 

জুতো উল্টো হয়ে থাকলে সাধারণত এর নিচের তলার ময়লা বা ধুলাবালি দৃশ্যমান হয়। অনেকে মনে করেন, জুতো উল্টো হয়ে আসমানের দিকে মুখ করে থাকাটা এক ধরণের অসম্মান বা বেয়াদবি, কারণ আমরা আসমানের দিকে হাত তুলে দোয়া করি। তবে হাদিসে সরাসরি এমন কোনো কথা বলা হয়নি।

পরিচ্ছন্নতা ও সৌন্দর্য:

ইসলাম পরিচ্ছন্নতার ওপর অত্যন্ত জোর দিয়েছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: "নিশ্চয়ই আল্লাহ সুন্দর এবং তিনি সৌন্দর্যকে ভালোবাসেন।" (সহিহ মুসলিম)

জুতো এলোমেলো করে বা একটার ওপর আরেকটা রাখলে তা নোংরা দেখায় এবং জুতো নষ্ট হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। তাই জুতো সোজা এবং গুছিয়ে রাখা ইসলামের পরিচ্ছন্নতা ও শৃঙ্খলার নীতির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ।

 আর জুতো উল্টো বা এলোমেলো থাকলে তার নিচে বা ভেতরে বিষাক্ত পোকামাকড় (যেমন বিছা বা মাকড়সা) আশ্রয় নিতে পারে। রাসুলুল্লাহ (সা.) রাতে ঘুমানোর আগে পাত্র ঢেকে রাখা, বাতি নেভানো এবং জুতো পরার আগে তা ঝেড়ে নেওয়ার তাগিদ দিয়েছেন, যাতে কোনো ক্ষতিকর জীবজন্তু থেকে নিরাপদ থাকা যায়।


ইসলামী দৃষ্টিকোণের বাইরেও বাস্তবসম্মত কিছু কারণে জুতো গুছিয়ে ও সোজা রাখা উচিত:

 শৃঙ্খলা ও পরিচ্ছন্নতা: জুতো সোজা ও নির্দিষ্ট স্থানে রাখলে ঘর গোছানো দেখায়। জুতোর উপর জুতো রাখলে নিচের জুতোটি নোংরা বা বিকৃত হয়ে যেতে পারে।

 নিরাপত্তা: জুতো উল্টো হয়ে থাকলে বা জুতোর নিচে কাদা-ময়লা থাকলে তা ঘরের মেঝেতে লেগে নোংরা হতে পারে।


 শায়খ ইবনে উসাইমীন (রহ.)-এর ফতোয়া

বিংশ শতাব্দীর অন্যতম প্রখ্যাত ফকিহ ও সৌদি আরবের সর্বোচ্চ উলামা পরিষদের সদস্য শায়খ মুহাম্মাদ বিন সালিহ আল-উসাইমীন (রহ.)-কে সরাসরি এ বিষয়ে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল যে জুতো উল্টো করে রাখলে নাকি রহমতের ফেরেশতা আসে না বা আল্লাহ সেই ঘরের দিকে তাকান না, এটি কতটুকু সত্যি?

তিনি উত্তর দেন: এই ধারণাটি সম্পূর্ণ ভুল এবং অসত্য। জুতো উল্টো করে রাখার মধ্যে শরীয়তগত কোনো সমস্যা বা পাপ আছে বলে আমার জানা নেই। কিছু মানুষের কাছে এটি খুব বড় বা মারাত্মক বিষয় মনে হলেও, ইসলামে এর কোনো ভিত্তি নেই।

 (ফতোয়া গ্রন্থ: নূরুন আলাদ দর্ব, ১৩/৬৫)


 লিজনাহ আদ-দাইমাহ (সৌদি আরবের স্থায়ী ফতোয়া কমিটি)

সৌদি আরবের শীর্ষ আলেমদের সমন্বয়ে গঠিত স্থায়ী ফতোয়া কমিটিকে প্রাচীনপন্থী বা বয়স্ক মানুষের এই বিশ্বাসের ব্যাপারে প্রশ্ন করা হলে তারা জানান

জুতো উল্টো করে রাখলে কোনো অমঙ্গল হয় এমন বিশ্বাস রাখা ইসলামে নিষিদ্ধ। তবে জুতো উল্টো করে রাখাটা সামাজিকভাবে একটি অপছন্দনীয় দৃশ্য। কারণ জুতোর তলা দিয়ে মানুষ রাস্তায় হাঁটে, যেখানে ময়লা-আবর্জনা লেগে থাকে। সেই ময়লাযুক্ত তলাটি ওপরের দিকে বা মানুষের চোখের সামনে প্রকাশ করে রাখাটা সুন্দর দেখায় না। তাই কেবল শিষ্টাচার ও পরিচ্ছন্নতার খাতিরে জুতো সোজা করে রাখা উচিত, কোনো ধর্মীয় ভয়ের কারণে নয়।

 (ফাতাওয়া আল-লিজনাহ আদ-দাইমাহ, ২৬/৩০২-৩০৩)


 ইমাম ইবনে আকিল আল-হাম্বলী (রহ.)-এর বক্তব্য

হাদিস ও ফিকহের প্রাচীন গ্রন্থ - আল-আদাব আশ-শারইয়্যাহ তে উল্লেখ রয়েছে যে, প্রখ্যাত হাম্বলী ওলি ও আলেম ইবনে আকিল (রহ.) এই বিষয়টিকে মূর্খদের বাড়াবাড়ি বলে আখ্যায়িত করেছেন। তিনি বলেছেন, অজ্ঞ লোকেরা এমন কিছু বিষয় নিয়ে কড়াকড়ি বা ভয় দেখায় যার কোনো ভিত্তি নেই, যেমন রুটি উল্টো করে রাখা কিংবা জুতোর তলা আকাশের দিকে মুখ করে রাখা।

জমহুর (অধিকাংশ) আলেম ও গবেষকদের যৌথ সিদ্ধান্ত

দারুল ইফতা এবং সমসাময়িক ইসলামিক চিন্তাবিদদের মতে, জুতোর উপর জুতো রাখা কিংবা জুতো উল্টো থাকার সাথে ভাগ্য পরিবর্তন, রিজিক কমে যাওয়া বা শয়তানের বসার কোনো সম্পর্ক নেই।

জমহুর উলামায়ে কেরাম বিষয়টিকে দুটি ভাগে ভাগ করে ব্যাখ্যা করেন:

 আকিদাগত অবস্থান (বিশ্বাস): যদি কেউ মনে করে জুতো উল্টো রাখলে অমঙ্গল হবে বা জুতোর উপর জুতো রাখলে সফর (ভ্রমণ) হবে, তবে তা বদমিনতি বা অশুভ লক্ষণ মানার শামিল, যা ইসলামে ছোট শিরক  হিসেবে গণ্য। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: অশুভ লক্ষণ বিশ্বাস করা শিরক।

 (সুনানে আবু দাউদ)

  ইসলাম একটি রুচিশীল ও পরিচ্ছন্ন ধর্ম জুতো এলোমেলো বা উল্টো করে রাখলে ঘরের সৌন্দর্য নষ্ট হয় এবং জুতো দ্রুত নষ্ট হতে পারে। এছাড়া রাসুলুল্লাহ (সা.) জুতো পরার আগে তা ঝেড়ে নিতে বলেছেন যেন ভেতরে কোনো ক্ষতিকর পোকা না থাকে। জুতো সোজা করে রাখলে ক্ষতিকর পোকা সহজে নজরে আসে।

 জমহুর আলেমদের সর্বসম্মত রায় হলো। জুতো উল্টো বা একটার ওপর আরেকটা রাখলে কোনো গুনাহ বা অমঙ্গল হয় না। তবে ভদ্রতা, পরিচ্ছন্নতা এবং ঘরের শৃঙ্খলার খাতিরে জুতো সোজা ও গুছিয়ে রাখা টাই ইসলামের আদব।

অত এব জুতো উল্টো রাখলে বা একটার ওপর আরেকটা রাখলে কোনো পাপ হয় না বা কোনো অমঙ্গল নেমে আসে না। তবে ঘরকে পরিচ্ছন্ন রাখতে, জুতো ভালো রাখতে এবং যেকোনো ধরনের কুসংস্কার থেকে মুক্ত থাকতে সবসময় জুতো সোজা এবং গুছিয়ে রাখাই উত্তম।


একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ